Abdul LatifNotes on banking & finance
Journal  /  রাজনীতি
রাজনীতি

নর্ডিক মডেল বনাম বাংলাদেশ(উইনার-টেকস-অল)

নর্ডিক মডেল কেন ভাল এবং বর্তমান প্রেক্ষাপটে এটি কেন বেশী প্রয়োজন বিশেষ করে বাংলাদেশের রাজীনিতে এই মডেল কি ভূমিকা রাখাতে পারে।

নর্ডিক মডেল বনাম বাংলাদেশ(উইনার-টেকস-অল)

আজকের আলোচনার বিষয় হলো বর্তমান সময়ের আমাদের দেশের চলমান রাজনীতি ও তাতে কি করণীয়। কোন নির্দিষ্ট গোষ্ঠী কিংবা কারো স্বার্থে এই আলোচনা নয়। এটি সাধারণ মানুষ কিভাবে বর্তমান সময়ের রাজনীতিকে পর্যবেক্ষণ করছে তা নিয়ে আলোচনা। বিষয়টি আরো সহজ ভাবে বুঝতে আমি এখানে বিশ্বের একটি জনপ্রিয় রাজনীতির মডেল নিয়ে এখানে কিছুটা আলোচনা করেছি প্রথমে। সেটি হলো নর্ডিক মডেল যা নর্ডিক দেশগুলো নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। আমরা যখন এই মডেল ভাল করে বুঝতে পারবো তখন নিজে নিজে আমরা বর্তমান আমাদের রাজনীতির গতিপথ বুঝতে পারবো। এজন্য প্রথমে আমরা নর্ডিক মডেল কি সেটা জেনে নেই।

নর্ডিক মডেলে পরিচালিত সমাজ অর্থনীতি

নর্ডিক মডেল (Nordic Model) হলো উত্তর ইউরোপের নর্ডিক দেশগুলোর (ডেনমার্ক, নরওয়ে, সুইডেন, ফিনল্যান্ড এবং আইসল্যান্ড) অনুসৃত একটি বিশেষ আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক শাসনব্যবস্থা। এটি মূলত পুঁজিবাদী মুক্তবাজার অর্থনীতি (Free-market Capitalism) এবং গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র বা সামাজিক সুরক্ষার (Comprehensive Welfare State) এক ভারসাম্যপূর্ণ সমন্বয়।

সহজ কথায়, এই ব্যবস্থায় একদিকে ব্যবসা-বাণিজ্য ও উদ্ভাবনের অবাধ সুযোগ থাকে, অন্যদিকে অর্জিত মুনাফা ও করের মাধ্যমে সমাজের প্রতিটি নাগরিকের খাদ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পেনশনের মতো মৌলিক অধিকার পুরোপুরি নিশ্চিত করা হয়।

নর্ডিক মডেল (সুইডেন, নরওয়ে, ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড ও আইসল্যান্ডের রাষ্ট্রব্যবস্থা) হলো কার্যকর সামাজিক নিরাপত্তা, নিয়ন্ত্রিত মুক্তবাজার অর্থনীতি এবং জবাবদিহিতামূলক গণতন্ত্রের এক অনন্য ভারসাম্য। অন্যদিকে, বাংলাদেশ একটি দ্রুত পরিবর্তনশীল, জনবহুল এবং উন্নয়নশীল রাষ্ট্র, যা দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা কাটিয়ে রাষ্ট্র সংস্কারের এক সন্ধিক্ষণে রয়েছে।

প্রধান সূচক ও কাঠামোগত তুলনা

ক্ষেত্র

নর্ডিক মডেল

বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপট

শাসনব্যবস্থা ও রাজনীতি

আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব, সমঝোতাভিত্তিক রাজনীতি ও বহুত্ববাদ।

'উইনার-টেকস-অল' ভিত্তিক নির্বাচনী রাজনীতি, তীব্র মেরুকরণ ও দলীয়করণ।

সামাজিক চুক্তি ও কর

উচ্চ করহার (৪০%–৫০%+); বিনিময়ে নিখরচায় মানসম্মত শিক্ষা, চিকিৎসা ও পেনশন।

কম কর-জিডিপি অনুপাত (১০%-এর নিচে); নাগরিক সেবার মান দুর্বল, স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় ব্যক্তিগত ব্যয় খুব বেশি।

সামাজিক আস্থা ও সংস্কৃতি

সমাজে পারস্পরিক আস্থা ও প্রতিষ্ঠানের প্রতি বিশ্বাস বিশ্বের সর্বোচ্চ।

প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার ওপর তীব্র আস্থার সংকট (Trust Deficit)।

শ্রম ও অর্থনীতি

যৌথ দরকষাকষি (Tripartite model), শক্তিশালী ইউনিয়ন ও সুরক্ষিত ন্যূনতম অধিকার।

অনানুষ্ঠানিক খাতের আধিপত্য, শ্রম অধিকারের দুর্বল বাস্তবায়ন ও মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব।

দুর্নীতি ও স্বচ্ছতা

উন্মুক্ত সরকারি তথ্য, কঠোর জবাবদিহিতা ও কার্যকর শূন্য দুর্নীতি।

প্রাতিষ্ঠানিক আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, অর্থপাচার ও সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রিত খাত।

 নর্ডিক মডেলের ৩টি মৌলিক ভিত্তি

১.    সর্বজনীন কল্যাণ রাষ্ট্র (Universal Welfare State): রাষ্ট্র প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা দেয়। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। কেউ চাকরি হারালে বা অসুস্থ হলে রাষ্ট্রীয় সামাজিক সুরক্ষাবলয় তাকে দারিদ্র্যসীমার নিচে নামতে দেয় না।

২.    উচ্চ কর বনাম উচ্চ সামাজিক রিটার্ন: নাগরিকরা স্বেচ্ছায় তাদের আয়ের একটি বড় অংশ কর হিসেবে দেয়, কারণ তারা নিজ চোখে দেখে সেই করের অর্থ কীভাবে উন্নত হাসপাতাল, স্কুল এবং গণপরিবহনে সরাসরি বিনিয়োগ হচ্ছে।

৩.    সমঝোতার রাজনৈতিক সংস্কৃতি (Consensus Politics): ক্ষমতা দখলের অন্ধ লড়াইয়ের বদলে দলগুলো জাতীয় ইস্যুতে একসাথে বসে সিদ্ধান্ত নেয়। প্রধানমন্ত্রী বা মন্ত্রীদের কোনো বিলাসী প্রটোকল থাকে না; তারা সাধারণ মানুষের মতো জীবনযাপন করেন।

বাংলাদেশের প্রধান চ্যালেঞ্জসমূহ

  • জনসংখ্যার ঘনত্ব ও সম্পদ সীমাবদ্ধতা: নর্ডিক দেশগুলোর মোট জনসংখ্যা মাত্র পৌনে তিন কোটির মতো, যেখানে বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৭ কোটিরও বেশি। সীমিত ভৌগোলিক সীমায় এত বিপুল জনসংখ্যার মৌলিক চাহিদা মেটানো কাঠামোগতভাবেই জটিল।
  • অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির পরিধি: বাংলাদেশে ৮০%-এর বেশি মানুষ অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করে। ফলে নিয়মিত কর আদায় এবং সর্বজনীন সামাজিক নিরাপত্তা চালু করা কঠিন হয়ে পড়ে।
  • প্রতিষ্ঠানিক ভঙ্গুরতা: বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন, পুলিশ এবং প্রশাসনের মতো রাষ্ট্রীয় স্তম্ভগুলো দীর্ঘদিন দলীয় স্বার্থে ব্যবহৃত হওয়ায় নাগরিকদের মধ্যে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার প্রতি অনাস্থা তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশ নর্ডিক মডেল থেকে কী কী গ্রহণ করতে পারে?

নর্ডিক মডেল হুবহু কোনো দেশে স্থানান্তর করা সম্ভব নয়, তবে এর মূল দর্শন থেকে বাংলাদেশ বাস্তবসম্মত সংস্কার শুরু করতে পারে:

  •  স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় বরাদ্দ বৃদ্ধি: জিডিপির সিংহভাগ অবকাঠামো নির্মাণে ব্যয় না করে মানবসম্পদ উন্নয়ন—বিশেষ করে প্রাথমিক শিক্ষা ও মানসম্মত সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবায় অগ্রাধিকার দেওয়া।
  • স্বচ্ছতা ও তথ্যের অবাধ প্রবাহ: সরকারি প্রতিটি ক্রয় (Procurement), টেন্ডার এবং প্রকল্প ব্যয়ের তথ্য জনগণের জন্য উন্মুক্ত করে দুর্নীতি রোধ করা।
  • দ্বিদলীয়/বহুদলীয় সমঝোতা: নির্বাচন, সংবিধান ও জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যুতে ধ্বংসাত্মক সংঘাতের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে জাতীয় ঐকমত্যের প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা।
  • সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির স্বচ্ছতা: দলীয় প্রভাবমুক্ত করে ডিজিটাল পদ্ধতিতে প্রকৃত দরিদ্রদের কাছে রাষ্ট্রীয় ভাতা ও সহায়তা সরাসরি পৌঁছে দেওয়া।

সুস্থ্য রাজণীতি কেন ব্যর্থ বাংলাদেশে

১. ব্যক্তিগত সুবিধাবাদঃ দীর্ঘ ঔপনিবেশিক শাসন, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার কারণে বাঙালির মনস্তত্ত্বে "রাষ্ট্র বা অপর পক্ষ আমাকে ঠকাতে পারে"—এই গভীর অবিশ্বাস প্রোথিত। ফলে সমষ্টিগত মঙ্গলের চেয়ে নিজের বা পরিবারের তাৎক্ষণিক সুবিধা নিশ্চিত করাকেই বাঙালি বুদ্ধিমানের কাজ মনে করে।

২. কর ফাঁকি দেওয়ার মানসিকতা ও রাষ্ট্রীয় সেবা প্রত্যাশা-  বাঙালি ন্যূনতম কর দিয়ে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা দাবি করতে অভ্যস্ত। কর দেওয়াকে নিজের কষ্টার্জিত অর্থের অপচয় বা দুর্নীতির তহবিলে যোগান হিসেবে দেখা হয়। রাষ্ট্রের ওপর এই আস্থাহীনতার কারণে উচ্চ কর হারের মডেল বাঙালি সমাজে প্রবল বিরোধিতার মুখে পড়বে।

৩. ব্যক্তিকেন্দ্রিক পরিবারতন্ত্র বনাম প্রাতিষ্ঠানিক সমষ্টিবাদ - বাঙালির নিরাপত্তা জাল সমাজ বা রাষ্ট্র নয়, বরং পরিবার ও রক্তের সম্পর্ক। সঞ্চয়, জমি কেনা বা সম্পদ কুক্ষিগত করার প্রবণতা তীব্র, কারণ রাষ্ট্র বিপদে পাশে দাঁড়াবে না—এই ধারণা মনে গেঁথে আছে। ফলে রাষ্ট্রের হাতে সার্বিক সামাজিক দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়ার মতো প্রাতিষ্ঠানিক নির্ভরতায় বাঙালির মানসিক অনীহা রয়েছে।

৪. ‘তদবির কালচার’ ও নিয়ম ভাঙার প্রবণতা- বাঙালির স্বভাব: নিয়ম মানার চেয়ে নিয়মের ফাঁকফোকর বের করা বা প্রভাব খাটিয়ে কাজ দ্রুত উদ্ধার করাকে বাঙালি কৃতিত্বের প্রতীক মনে করে। ক্ষমতা, পদমর্যাদা বা পরিচিতি ব্যবহার করে বিশেষ সুবিধা নেওয়ার এই মানসিকতা নর্ডিক মডেলের কঠোর স্বচ্ছতার সম্পূর্ণ বিপরীত।

৫. মর্যাদাবোধের শ্রেণিবিন্যাস (Status Consciousness)- বাঙালির স্বভাব: বাঙালি সমাজে পদমর্যাদা, তথাকথিত ‘ভদ্রলোক’ শ্রেণি এবং কায়িক শ্রমের প্রতি এক ধরণের লুকানো অবজ্ঞা বিদ্যমান। টেবিল-চেয়ারে বসে কাজ করাকে শ্রেষ্ঠ মনে করা এবং পেশাভিত্তিক বৈষম্য নর্ডিক সমতাবাদের পথে বড় অন্তরায়।

৬. তাৎক্ষণিক আবেগ ও দীর্ঘমেয়াদী শৃঙ্খলার অভাব-বাঙালির স্বভাব: বাঙালি আবেগপ্রবণ ও তাৎক্ষণিক সমাধানে বিশ্বাসী। কোনো নিয়মের দীর্ঘমেয়াদী সুফল পেতে যে নিয়মিত শৃঙ্খলা ও ত্যাগ স্বীকার দরকার, সেখানে ধৈর্যের ঘাটতি দেখা যায়।

সংম্পৃক্ত পোস্ট

পড়া উচিত

নর্ডিক মডেলউইনার-টেকস-অলComprehensive Welfare Stateবাংলাদেশের রাজনীতিতে চ্যালেঞ্জ সমূহকাদের জন্য রাজনীতি